রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাব্যসাধনার ইতিহাসে ‘খেয়া’ (১৯০৬) এক অনন্য ও রূপান্তরমুখী সৃষ্টি। ১৯০৬ সালে (১৩১৩ বঙ্গাব্দে) প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজীবনের “অন্তর্বর্তী পর্ব”-এর শেষ সীমা এবং বিশ্ববিশ্রুত “গীতাঞ্জলি পর্ব”-এর প্রত্যক্ষ পূর্বাভাস। পার্থিব রূপ-রস-শব্দ-গন্ধের জগৎ থেকে কবিচেতনা যখন অরূপ, পরম সত্তা ও আধ্যাত্মিক সুন্দরের পানে ধাবিত হচ্ছিল, সেই সন্ধিক্ষণেই জন্ম নেয় খেয়ার কবিতাগুলো।
এই কাব্যগ্রন্থটি রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিন্নহৃদয় বন্ধু, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. জগদীশচন্দ্র বসুকে উৎসর্গ করেন—‘শ্রীযুক্ত জগদীশচন্দ্র বসু সুহৃদ্বরেষু’। ১৯০২ থেকে ১৯০৫ সালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবনে নেমে এসেছিল চরম শোকাঘাত; স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কন্যা রেণুকা এবং পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ কবিকে এক গভীর বৈরাগ্য ও আত্মবীক্ষণের দিকে ঠেলে দেয়। একই সময়ে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ থেকে নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়ে কবি রূপাতীত ও শাশ্বত এক আশ্রয় খুঁজছিলেন। সেই বেদনাময় বৈরাগ্য ও ঐশ্বরিক শরণাগতিরই অম্লান প্রতিফলন এই খেয়া।
‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থের মূল সুর বিষাদ, ক্লান্তি, প্রতীক্ষা ও ঐশ্বরিক সমর্পণ। এখানে ‘খেয়া’ বা ‘খেয়ানৌকা’ কেবল পারাপারের সাধারণ মাধ্যম নয়, বরং তা মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, ইহলোক ও পরলোকের সীমা এবং পরম সত্তার সাথে মিলনের এক চিরন্তন রূপক। ঘাটে বসে থাকা, দিন শেষের আলো-ছায়া, প্রদীপ জ্বালানো, কিংবা নিঃশব্দে পথ চেয়ে থাকার মতো প্রাত্যহিক জীবনের সরল চিত্রকল্পগুলোকে কবি রূপক-প্রতীকের সুবিন্যস্ত বুননে এক অতীন্দ্রিয় উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় খেয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যে ‘সং অফারিংস’ (Song Offerings)-এর জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন, সেই সংকলনে স্থান পাওয়া ১০৩টি কবিতার মধ্যে ১১টি কবিতাই ছিল ‘খেয়া’ কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। অর্থাৎ, বিশ্ব দরবারে রবীন্দ্রনাথকে চেনার ও অনুধাবন করার যে যাত্রা, তার অন্যতম মূল ভিত্তিপ্রস্তর ছিল এই কাব্য।
খেয়া কাব্যগ্রন্থের যাচাইকৃত কবিতা সূচি (সম্পূর্ণ ৫৫টি কবিতা)
১. শেষ খেয়া
২. ঘাটের পথে
৩. ঘাটে
৪. শুভক্ষণ
৫. ত্যাগ
৬. আগমন
৭. দুঃখমূর্তি
৮. মুক্তিপাশ
৯. প্রভাতে
১০. দান
১১. বালিকা বধূ
১২. অনাহত
১৩. বাঁশি
১৪. অনাবশ্যক
১৫. অবারিত
১৬. গোধূলিলগ্ন
১৭. লীলা
১৮. মেঘ
১৯. নিরুদ্যম
২০. কৃপণ
২১. কুয়ার ধারে
২২. জাগরণ
২৩. ফুল ফোটানো
২৪. হার
২৫. বন্দী
২৬. পথিক
২৭. মিলন
২৮. বিচ্ছেদ
২৯. বিকাশ
৩০. সীমা
৩১. ভার
৩২. টিকা
৩৩. বৈশাখে
৩৪. বিদায়
৩৫. পথের শেষ
৩৬. নীড় ও আকাশ
৩৭. সমুদ্রে
৩৮. দিনশেষ
৩৯. সমাপ্তি
৪০. কোকিল
৪১. দিঘি
৪২. ঝড়
৪৩. প্রতীক্ষা
৪৪. গান শোনা
৪৫. হারাধন
৪৬. চাঞ্চল্য
৪৭. প্রচ্ছন্ন
৪৮. অনুমান
৪৯. বর্ষাপ্রভাত
৫০. বর্ষাসন্ধ্যা
৫১. সব-পেয়েছির দেশ
৫২. সার্থক নৈরাশ্য
৫৩. প্রার্থনা
৫৪. খেয়া
৫৫. অবসান







![আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে কবিতা [গীতাঞ্জলি] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 3 সংশয়ের আবেগ কবিতা । sangsayer abeg kobita | মানসী কাব্যগ্রন্থ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর](https://amarrabindranath.com/wp-content/uploads/2022/04/images-7-2-e1649150434648.jpg)



