কথা কাব্যগ্রন্থের বিচারক কবিতা – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইতিহাস-আশ্রিত আখ্যানকাব্য ‘কথা’-র একটি তেজোদৃপ্ত, নীতিবাদী ও বীরত্বব্যঞ্জক কবিতা হলো ‘বিচারক’। ক্ষাত্রশক্তি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অহংকারকে পদদলিত করে সত্য, ন্যায়বিচার ও আত্মমর্যাদার শাশ্বত জয়গান এ কবিতায় মারাঠা ইতিহাসের এক ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে অসামান্য মহিমায় মূর্ত হয়েছে।

কবিতার মূল তথ্য:

বিষয়বিবরণতথ্য
কবিতার নামবিচারক
কবির নামরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
মূল কাব্যগ্রন্থকথা (পরবর্তীকালে ‘কথা ও কাহিনী’)
প্রকাশের বছর১৯০০ (১৩৬ বঙ্গাব্দ)
কবিতার ধরনঐতিহাসিক আখ্যান-কবিতা / নীতিবাদী বীরগাথা (Narrative Ballad / Moral-Heroic Poem)

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মূল উৎস:

কবিতাটির উৎস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং পাদটীকায় উল্লেখ করেছেন:
  1. পণ্ডিত শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন-প্রণীত ‘চরিতমালা’।
  2. অ্যাকওয়ার্থ (H. A. Acworth) সংকলিত Ballads of the Marathas গ্রন্থে বর্ণিত রঘুনাথ রাও কর্তৃক তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র নারায়ণ রাও হত্যার মারাঠি গাথা।
পেশোয়া নারায়ণ রাওকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন রঘুনাথ রাও (রাঘোবা)। এরপর তিনি হয়দর আলির বিরুদ্ধে বিশাল সমরযাত্রা শুরু করেন। আশি হাজার সৈন্যের সমরোন্মত্ত জয়যাত্রার মুখে নির্ভীক প্রধান বিচারপতি রামশাস্ত্রী পথ আগলে দাঁড়ান। তিনি স্পষ্ট জানান—স্বজনহত্যাকারী রাজা যতক্ষণ পর্যন্ত প্রায়শ্চিত্ত বা শাস্তির অধীন না হচ্ছেন, ততক্ষণ তিনি স্বাধীন নন, ধর্মের বিচারে তিনি অপরাধী ও বন্দি। ক্ষমতার মোহে অন্ধ রঘুনাথ রাও ন্যায়বিচারের ভাষ্য অগ্রাহ্য করলে, আপসহীন রামশাস্ত্রী কোনো পদলোভ বা রাজানুগ্রহের তোয়াক্কা না করে বিচারশালার উচ্চপদ ত্যাগ করে নিঃস্ব ব্রাহ্মণের বেশে নিজ গ্রামে ফিরে যান।

বিচারক কবিতা (সম্পূর্ণ কবিতা)

পন্ডিত শম্ভুচন্দ্র বিদ্যারত্ন-প্রণীত চরিতমালা হইতে গৃহীত।

অ্যাকওয়ার্থ সাহেব-প্রণীত Ballads of the Marathas নামক গ্রন্থে রঘুনাথের ভ্রাতুষ্পুত্র নারায়ণ রাওয়ের হত্যা সম্বন্ধে প্রচলিত মারাঠি গাথার ইংরেজি অ্যানুবাদ প্রকাশিত হইয়াছে।

পুণ্য নগরে রঘুনাথ রাও

          পেশোয়া-নৃপতি-বংশ

রাজাসনে উঠি কহিলেন বীর,

“হরণ করিব ভার পৃথিবীরড্ড

মৈসুরপতি হৈদরালির

            দর্প করিব ধ্বংস।’

দেখিতে দেখিতে পুরিয়া উঠিল

          সেনানী আশি সহস্র।

নানা দিকে দিকে নানা পথে পথে

মারাঠার যত গিরিদরি হতে

বীরগণ যেন শ্রাবণের স্রোতে

          ছুটিয়া আসে অ্যাজস্র।

উড়িল গগনে বিজয়পতাকা,

          ধ্বনিল শতেক শঙ্খ।

হুলুরব করে অ্যাঙ্গনা সবে,

মারাঠা-নগরী কাঁপিল গরবে,

রহিয়া রহিয়া প্রলয়-আরবে

          বাজে ভৈরব ডঙ্ক।

ধুলার আড়ালে ধ্বজ-অ্যারণ্যে

          লুকালো প্রভাতসূর্য।

রক্ত অ্যাশ্বে রঘুনাথ চলে,

আকাশ বধির জয়কোলাহলে–

সহসা যেন কী মন্ত্রের বলে

          থেমে গেল রণতূর্য!

সহসা কাহার চরণে ভূপতি

          জানালো পরম দৈন্য?

সমরোন্মাদে ছুটিতে ছুটিতে

সহসা নিমেষে কার ইঙ্গিতে

সিংহদুয়ার থামিল চকিতে

          আশি সহস্র সৈন্য?

ব্রাহ্মণ আসি দাঁড়ালো সমুখে

          ন্যায়াধীশ রামশাস্ত্রী।

দুই বাহু তাঁর তুলিয়া উধাও

কহিলেন ডাকি, “রঘুনাথ রাও,

নগর ছাড়িয়া কোথা চলে যাও,

          না লয়ে পাপের শাস্তি?’

নীরব হইল জয়কোলাহল,

          নীরব সমরবাদ্য।

“প্রভু, কেন আজি’ কহে রঘুনাথ,

“অ্যাসময়ে পথ রুধিলে হঠাৎ!

চলেছি করিতে যবননিপাত,

          জোগাতে যমের খাদ্য।’

কহিলা শাস্ত্রী, “বধিয়াছ তুমি

          আপন ভ্রাতার পুত্রে।

বিচার তাহার না হয় য’দিন

ততকাল তুমি নহ তো স্বাধীন,

বন্দী রয়েছ অ্যামোঘ কঠিন

          ন্যায়ের বিধানসূত্রে।’

রুষিয়া উঠিলা রঘুনাথ রাও,

          কহিলা করিয়া হাস্য,

“নৃপতি কাহারো বাঁধন না মানে–

চলেছি দীপ্ত মুক্ত কৃপাণে,

শুনিতে আসি নি পথমাঝখানে

          ন্যায়বিধানের ভাষ্য।’

কহিলা শাস্ত্রী, “রঘুনাথ রাও,

          যাও করো গিয়ে যুদ্ধ!

আমিও দণ্ড ছাড়িনু এবার,

ফিরিয়া চলিনু গ্রামে আপনার,

বিচারশালার খেলাঘরে আর

          না রহিব অ্যাবরুদ্ধ।’

বাজিল শঙ্খ, বাজিল ডঙ্ক,

          সেনানী ধাইল ক্ষিপ্র।

ছাড়ি দিয়া গেলা গৌরবপদ,

দূরে ফেলি দিলা সব সম্পদ,

গ্রামের কুটিরে চলি গেলা ফিরে

          দীন দরিদ্র বিপ্র।

Bicharok Kobita Romanized Version:

Punyo nogore Roghunath Rao
Peshwa-nripoti-bongsho
Rajasone uthi kohilen bir,
“Horono koribo bhar pritthibir,
Moisuropoti Hoidoralir
Dorpo koribo dhongsho.’
Dekhite dekhite puriya uthilo
Shenani ashi shohoshro.
Nana dike dike nana pothe pothe
Marathar joto giridori hote
Birgon jeno shraboner srote
Chhutiya ashe ojoshro.
Urilo gogone bijoypotaka,
Dhonilo shoteko shongkho.
Hulurobo kore ongona shobe,
Maratha-nogori kampilo gorobe,
Rohiya rohiya proloy-arobe
Baje bhoirobo dongko.
Dhular arale dhyoj-oronye
Lukalo probhatoshurjo.
Rokto oshwe Roghunath chole,
Akash bodhir joyokolahole–
Shohosa jeno ki montrer bole
Theme gelo ronoturjo!
Shohosa kahar chorone bhupoti
Janalo porom doinno?
Shomoronmade chhūtite chhūtite
Shohosa nimeshe kar inggite
Shinghoduyare thamilo chokite
Ashi shohoshro shoinno?
Bramhon ashi daralo shomukhe
Nayadhish Ramshastri.
Dui bahu tar tuliya udhao
Kohilen daki, “Roghunath Rao,
Nogor chhariya kotha chole jao,
Na loye paper shasti?’
Nirobo hoilo joyokolahol,
Nirobo shomorobaddo.
“Probhu, keno aji’ kohe Roghunath,
“Oshomoye poth rudhile hothat!
Cholechhi korite jobononipat,
Jogate jomer khaddo.’
Kohila Shastri, “Bodhiyachho tumi
Apon bhratar putre.
Bichar tahar na hoy jo’din
Totokal tumi noho to swadhin,
Bondi royechho omogh kothin
Nayer bidhanshutre.’
Rushiya uthila Roghunath Rao,
Kohila koriya hashsho,
“Nripoti kaharo bandhon na mane–
Cholechhi dipto mukto kripane,
Shunite ashi ni pothomajhkhane
Naybidhaner bhashsho.’
Kohila Shastri, “Roghunath Rao,
Jao koro giye juddho!
Amio dondo chharinu ebar,
Phiriya cholinu grame aponar,
Bicharshalar khelaghore ar
Na rohibo oboruddho.’
Bajilo shongkho, bajilo dongko,
Shenani dhailo kkhipro.
Chhari diya gela gourobopod,
Dure pheli dila shob shompod,
Gramer kutire choli gela phire
Din doridro bipro.

কবিতার মূল ভাব ও বিশ্লেষণ:

  • রাজশক্তির অন্ধ অহংকার ও সমরোন্মাদনা:
    “উড়িল গগনে বিজয়পতাকা, / ধ্বনিল শতেক শঙ্খ। / … রক্ত অশ্বে রঘুনাথ চলে, / আকাশ বধির জয়কোলাহলে–“
    — আশি হাজার সেনার রণহুংকার, শঙ্খ ও ভৈরব ডঙ্কার নিনাদে পুণে নগরী প্রকম্পিত। বহিরাগত শত্রু দমনের উদ্দেশ্যে রঘুনাথ রাও নিজেকে অপরাজেয় বীর ভাবলেও, এই আড়ম্বর আসলে স্বজনহত্যার অভ্যন্তরীণ পাপকে ধামাচাপা দেওয়ারই এক উন্মাদ প্রয়াস।
  • নৈতিক শক্তির অপরাজেয় তেজ:
    “কহিলা শাস্ত্রী, ‘বধিয়াছ তুমি / আপন ভ্রাতার পুত্রে। / বিচার তাহার না হয় য’দিন / ততকাল তুমি নহ তো স্বাধীন, / বন্দী রয়েছ অমোঘ কঠিন / ন্যায়ের বিধানসূত্রে।'”
    — বিশাল সমরবাহিনীর গতিরোধ করতে একাকী বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়েছেন রামশাস্ত্রী। তাঁর অস্ত্র কোনো কৃপাণ নয়, সত্যের অমোঘ দণ্ড। পার্থিব রাজশক্তি যতই পরাক্রমশালী হোক, নৈতিক বিধান ও ন্যায়ের শিকল যে সম্রাটেরও ঊর্ধ্বে—বিচারকের এই নির্ভীক উচ্চারণে কবিতার চরম নাটকীয়তা উন্মোচিত হয়।
  • ক্ষমতার দাসত্ব বনাম ত্যাগের মহিমা:
    “আমিও দণ্ড ছাড়িনু এবার, / ফিরিয়া চলিনু গ্রামে আপনার, / বিচারশালার খেলাঘরে আর / না রহিব অবরুদ্ধ। / … ছাড়ি দিয়া গেলা গৌরবপদ, / দূরে ফেলি দিলা সব সম্পদ, / গ্রামের কুটিরে চলি গেলা ফিরে / দীন দরিদ্র বিপ্র।”
    — রাজা যখন ন্যায়কে পদদলিত করে শক্তির দম্ভ দেখায়, তখন সেই বিচারালয় সত্যের স্থান না হয়ে প্রহসনের ‘খেলাঘর’-এ পরিণত হয়। রামশাস্ত্রী অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি; ক্ষমতার পদ ও বৈষয়িক ঐশ্বর্য ধূলার মতো পরিত্যাগ করে তিনি দারিদ্র্যকে বরণ করেছেন। এই ত্যাগই ন্যায়দণ্ডের চিরন্তন আত্মমর্যাদাকে রক্ষা করেছে।

উৎস:

কবিতাটির মূল পাঠ (অনলাইন প্রতিলিপির টাইপো সংশোধনপূর্বক: ‘অজস্র’, ‘অঙ্গনা’, ‘অশ্ব’, ‘অমোঘ’ ইত্যাদি প্রামাণ্য রূপ গৃহীত), ঐতিহাসিক টীকা ও রচনাকাল-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রামাণ্য ‘রবীন্দ্র রচনাবলী’ (কথা কাব্যগ্রন্থ) থেকে সতর্কতার সাথে সংগ্রহ ও বিন্যস্ত করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন